গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে ওয়াজ মাহফিলের গুরুত্ব

Waz Mahfil
Share This:

মফস্বলে বেড়ে ওঠা ছেলে আমি। ছোটবেলায় ডিসেম্বর আর জানুয়ারি মাসটা ছিল যেন স্বপ্নের মতো দুটো মাস। এই দুই মাসেই ঘটত মজার মজার সব কান্ড- ফাইনাল পরীক্ষা শেষ, নানুর বাড়িতে ঘুরতে যাওয়া, রাতের বেলা ব্যাডমিন্টন, রমাদানের ঈদ, মহল্লায় বন্ধুদের নিয়ে বাড়ি বাড়ি চাল-ডাল উঠিয়ে মা-খালাদের পুরাতন শাড়ি দিয়ে প্যান্ডেল বানিয়ে পিকনিক, নতুন ক্লাসের নতুন বইয়ের ঘ্রাণ, স্কুলের ঢিলেঢালা ক্লাস, বাংলা বইয়ের গল্পগুলোর উত্তেজনা, পিঠেপুলি আর আর অবশ্যই অবশ্যই ওয়াজ মাহফিল। শবে বরাত, শবে ক্বদরের মতো আর একটা রাতই বাড়ির বাইরে ইচ্ছেমতো কাটানোর এক্সেস ছিল, সেটা এই ওয়াজ মাহফিলের রাতগুলোয়। বয়ান ওতো বুঝতাম না, মূল আকর্ষণ ছিলো, প্যান্ডেলের বাইরে হরেক রকম ভাজাপোড়া, মিঠেমন্ডা আর বন্ধুদের নিয়ে দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানো।

মাইকের যথেচ্ছা ব্যবহার, বক্তাদের অসামাঞ্জস্য বক্তব্য, গভির রাত পর্যন্ত চলা কথামালা, অতিরিক্ত বানিজ্যিকীকরণ- এরকম অনেক অভিযোগ উঠলেও স্টিল এই ওয়াজ মাহফিলগুলোই অধিকাংশ মানুষের ধর্মীয় কথা শোনার অনেক সময় একমাত্র সোর্স। এছাড়াও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বুষ্ট করার জন্যও ওযাজ মাহফিলের রয়েছে ব্যাপক গুরুত্ব। নীচে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে ওয়াজ মাহফিল নিযে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ ও কিছু সুপারিশমালা তুলে ধরা হলো।

১। যতই হাস্যকর, যতই আজগুবি উপাদান থাকুক স্টিল বাংলা সিনেমার দর্শকই কিন্তু দেশে সবচেয়ে বেশি। একসময় শুনেছিলাম, মাই টিভির টিআরপি নাকি সবচেয়ে বেশি, কারণ ওখানে সারাদিন বাংলা ছবি চালানো হয়। আপনার কাছে যতই জোকারি মনে হোক, সস্তা কৌতুক মনে হোক, গালগল্প মনে হোক, অসামাঞ্জস্য কথামালা মনে হোক, এইকথাগুলোই কিন্তু গ্রামের মানুষগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো গভীর রাত পর্যন্ত শুনে থাকে ওয়াজ মাহফিলে। এভাবেই বছর পর বছর ধরে ওয়াজ মাহফিল গুলো চলে আসছে। এখন সমস্যা হয়েছে ভিডিওর সহজলভ্যতার কারণে নীলফামারীর গহীন কোন এক গ্রামের মানুষদের সামনে করা ওয়াজ মাহফিলের ভিডিও-ও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই তা আপনার ভাষাজ্ঞান, সাহিত্যজ্ঞানের সাথে কম্প্যাটিবল হচ্ছে না। এ নিয়ে হাসিতামাশা, মশকরা, রাজনীতি করার কিছু নেই। তাদের টিজি আপনি নন। সব মাহফিল কি আপনার দেখতে হবে, সবগুলো নিয়ে সমালোচনা করতে হবে, ছেড়ে দেন না কিছু গ্রামের মানুষের জন্য।

২। ২-৩ ঘন্টার একটি লেকচারে একটানা ধর্মের কথা বললে স্বাভাবিকভাবেই একঘেয়েমি চলে আসে। তখন একটু ডাইনে-বামে বলতে হয়। এখন বলতে পারেন ২-৩ ঘন্টা লেকচার দেয়ার দরকার কি, তখন আবার আয়োজকরা মাইন্ড করে। এতো টাকা দিয়ে আনলাম হুজুর মাত্র এক ঘন্টা ওয়াজ করেই ফুটলো। এতো দীর্ঘ সময় কথা বললে কিছু হাসিতামাশা করতেই হয়, ভুলভাল হওয়া স্বাভাবিক, আমাদের নিজেদেরও তো হয়, । ইউটিউব বা ফেসবুকের খন্ডিত ক্লিপ বা রোষ্টিং ভিডিও দেখে হুজুরদের পচানোর কিছু নেই। শরীয়াহর বিরুদ্ধে না গেলে এসব নির্দোষ কৌতুকে দোষের কিছু নেই। গ্রামের লোক এগুলোতেই মজা পায়।

৩। গ্রামের মানুষজন সারাদিন কাজেকর্মে ব্যস্ত থাকে। শীতকালে মাগরীবের পরপরই ঈশার ওয়াক্ত শুরু হয়ে যায়। তাই কোন বক্তার নিবরচ্ছিন্ন ওয়াজ করার একমাত্র অপশন হলো ঈশার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। এইসময়ই বেশি লোকসমাগম হয়। আমি দিনে অনেক ওয়াজ মাহফিল দেখেছি, মাছি মারার লোকও পাওয়া যায় না। কে চায় তাদের প্রোগ্রামটিকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করতে।

৪। গ্রামের প্রায় শতভাগ মসজিদে মহিলাদের প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পুরুষেরা তা-ও সপ্তাহান্তে জুমার সালাতে কিছু ঈমানী কথা শোনার সুযোগ পায়, কিন্তু মহিলাদের এরকম সুযোগ নেই বললেই চলে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে প্রায় প্রতিটি ওয়াজ মাহফিলেই মহিলাদের জন্য ওয়াজ শোনার ব্যবস্থা থাকে। ধরা যায়, এই ওয়াজ মাহফিলগুলোই মহিলাদের ঈমানী কথা শোনার একমাত্র সোর্স। কোন গ্রামে ওয়াজ মাহফিল হলে ওই গ্রামে থাকা লোকজনের বাড়িতে ওই কয়দিন আত্মীয়দের আনাগোণা শূরু হয়। দূরদুরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন বিশেষ করে মহিলারা বেড়াতে আসে ওয়াজ মাহফিল শোনার জন্য । এধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

৫। অধিকাংশ ওয়াজ মাহফিলের উদ্যোক্তা সাধারণত ইয়াতিমখানা বা মাদ্রাসা গুলো হয়ে থাকে। মাহফিলকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসাগুলোয় এককালীন একটা বড় ফান্ড কালেক্ট হয় বা বড় কোন কাজ (যেমন: বিল্ডিং বা ওযু খানা) এর এন্তেজাম হয়। যদি এরকম কিছু না-ও অর্জন হয় এট লিষ্ট প্রচার প্রচারণা হয়। অধিকাংশ মাদ্রাসা থাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে। এই মাহফিল গুলোর কারণে মানুষজন তাদের অস্তিত্বের জানান পায়।

৬। শুধু মাদ্রাসাগুলোই নয় ওয়াজ মাহফিলের দিনগুলোতে পুরো গ্রামের অর্থনীতি-ও সামগ্রিকভাবে বুষ্ট আপ হয়। ছোট ছোট ব্যবসাগুলোর ফ্লাশ সেলের সুযোগ এনে দেয় এই মাহফিলগুলো। কিছু কিছু ব্যবসায়ই তৈরী হয় মাহফিলগুলোকে কেন্দ্র করে। মাহফিল যেখানে ব্যবসা সেখানে।

৭। শহরে প্যান্ডেলের বাইরে মাইক ব্যবহারের ঘোর বিরোধি হলেও গ্রামে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাবলিক ডিমান্ড থাকে মাইক দূর-দূরান্তে বসানোর। বিশেষ করে বেশি মাইক থাকলে মহিলারা ঘরে বসেই ওয়াজ শুনতে পারে। বিষয়টি গ্রামের মানুষদের পরামর্শের উপর ছেড়ে দেয়া যেতে পারে।

৮। বাকি থাকলো বক্তাদের অর্থদাবীর বিষয়টি। ভাইরে এটা মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগ। হুজুররাও কি এর বাইরে। যে বেশি মাহফিল জমাতে পারে, যে বেশি জনপ্রিয়, যার বক্তব্য শুনতে শ্রোতারা দূর-দুরান্ত থেকে ছুটে আসে তার ডিমান্ড বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রায় তিন চার মাস আগে শুনেছি, এই সিজনে আজহারী হুজুরের শিডিউল নাকি ফুল প্যাক্ড। মানে নতুন করে তাকে বুক করার কোন সুযোগ নেই। নেক্সট ইয়ারের জন্য বুকিং দিয়ে রাখতে হবে। এখন আজহারী হুজুরের ডিমান্ড অন্যদের মতো হবে না এটাই স্বাভাবিক। হুজুরদেরকে এই পরিমাণ অর্থ দিয়েও কিন্তু অর্গানাইজাররা লাভের মধ্যে থাকে। এটা তাদের মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর বিষয়।

মুসলিম অধ্যুষিত এই ভূখন্ডে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে স্তমিত করার জন্য সর্বব্যাপি প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে। যত্রতত্র যেখানে সেখানে গড়ে ওঠা এই মানহীন মাদ্রাসাগুলো, গ্রামে-গঞ্জে গভীর রাতে চলা এই ওয়াজ মাহফিলগুলোই দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মাঝে ইসলামের আলোকে নিভু নিভু জ্বালিয়ে রেখেছে। বক্তাদের শরীয়তবিরোধি কথা নিয়ে বিরোধিতা হতে পারে, চাপাবাজি, মিথ্যাচার নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, মাইকের যথেচ্ছা ব্যবহার নিয়ে নসিহাহ দেয়া যেতে পারে, কিন্তু ঢালাওভাবে ওয়াজ মাহফিলের বিরুদ্ধে, বক্তাদের বিরুদ্ধে, সর্বোপরি মাহফিলগুলো বন্ধের বিষয়ে ইসলামবিরোধিদের যে প্রচারণা, প্রচেষ্টা, সেই চেষ্টার গুড়ে বালি ঢেলে দিতে হবে। মাহফিলের আয়োজক ও বক্তাদেরও যৌক্তিক সমালোচনা বিবেচনায় নিয়ে সে অনুযায়ি পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে করে মাহফিলের উপর কেউ আঘাত হানতে না পারে। বেঁচে থাকুক এই মাহফিলগুলো, আল্লাহর ওয়াদা- ইসলামের নূরকে পূর্ণরুপে প্রজ্জ্বলিত করবেন, সেই ওয়াদার পেছনে উৎস হিসেবে কাজ করুক, মাহফিলগুলো। আমিন।

Share This:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *