Categories
ধর্ম

কুয়েটের র‌্যাগডে ও শাহবাগীদের গাত্রদাহ

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিন অর্থাৎ র‍্যাগ ডে টা সবাই একটু উদযাপন করতে চায়। কুয়েটের সিইসি-১৫ ব্যাচের ছাত্ররাও চেয়েছিল ব্যতিক্রমী কিছু করে তাদের শেষ দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে। কুয়েটকে অনেকেই ভুলভাবে কুয়েত উচ্চারণ করে, এটাকেই স্যাটায়ার করে সবাই মিলে কুয়েতি তথা আরবদের মতো করে জুব্বা ও শিমাঘ পড়ে উৎযাপন করেছে। এই আয়োজনে মেয়েরাও যেমন ছিল, তেমনি থাকার কথা হিন্দু স্টুডেন্টদেরও। এটা যে তারা আউট অফ রিলিজিয়াস সেন্টিমেন্ট থেকে করেছে ব্যাপারটা মোটেও সেরকম নয়, নিছক ফান-ই উদ্দেশ্য, ছবিগুলো দেখলেই যেকারও বুঝে আসার কথা। কিন্তু এতে বাঙ্গালিত্বে আঘাত লেগেছে স্যুট, প্যান্ট, টাই পড়া কিছু বিলিতি সেক্যুলার বাঙ্গালীর।

পোস্ট গুলো ঘাটতে যেয়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য বিভাগের আরও কিছু ছবি নজরে পড়লো! কেউ সেজেছে ভারতের তামিল ছবির নায়কের পোষাকে, কেউবা হাজার বছরের (!) বাঙ্গালী পোষাক লুঙ্গিতে (যদিও বিসিএসের প্রস্তুতি পর্বে শিখেছি লুঙ্গি একটি বার্মিজ শব্দ)। এই সবগুলো ‘চেতনা ফিল্টার’ উত্তীর্ণ হলেও আটকে গেছে সিএসই-১৫ ব্যাচ। কেউবা এখানে খুজে পেয়েছে বাঙ্গালিত্বের অভাব, কেউ সুশিক্ষার অভাব, কেউবা খুজে পেয়েছে আইএস কানেকশন।

আরব মরুভূমির দেশ। এখানকার প্রখর রোদ এবং ধুলাবালু থেকে বাচার জন্য জুব্বা খুবই আরামদায়ক একটি পোষাক, সেই সাথে রয়েছে পাগড়ি। নবীজী (সা.) এই জায়গাতেই জন্মগ্রহণ করেছেন, স্বাভাবিকভাবেই তিনিও এই পোষাক পড়েছেন। আমরাও নবীজী (সা.) এর প্রতি ভালোবাসা থেকে এই পোষাক পড়ার চেষ্টা করি। কিন্তু এই পোষাককে কিন্তু অপরিহার্য করে দেয়া হয় নি। নবীজী (সা.) এর উম্মাত যেমন আরবের মরুভূমির বুকে রয়েছে তেমনি এন্টার্কটিকার তীব্র শীতের দেশেও বাস করে। ইসলামে তাই কোন নির্দিষ্ট পোষাক সেট না করে পোষাকের ব্যাপারে কিছু নির্দিষ্ট গাইডলাইন দেয়া হয়েছে, যেমনঃ ঢিলেঢালা পোষাক পড়তে হবে, অন্য ধর্মের প্রতীক হতে পারবে না, ছেলেরা মেয়েদের, মেয়েরা ছেলেদের পোশাক পড়তে পারবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই নীতিমালাগুলো মেনে স্যুট প্যান্ট পড়েও যেমন ইসলামি পোষাক মেইনটেইন করা সম্ভব তেমনি জুব্বা পড়েও তা অনেক সময় অনৈসলামিক হয়ে যায় (অনেকেরই জুব্বা টাখনুর নীচে ঝুলতে দেখা যায়)।

তাই বোঝা যায়, জুব্বা, শিমাঘ ইসলামের কোন সলো পোষাক না। কিন্তু তারপরও ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ এই ইসলামোফোব ক্রিয়েচারগুলার কতটা ভয়ংকর হলে কিছু বাচ্চা পোলাপানের একটা নির্দোষ বিনোদনেও এরা বাধা হয়ে দাড়ায়। এতো ঘৃণা নিয়ে, এতো বিদ্বেষ নিয়ে এরা কিভাবে ঘুমায় আল্লাহু আ’লাম। চারদিকে ক্রমবর্ধমান হুজুরায়নের কারণে এদের সৃষ্ট গাত্রদাহ ও মানসিক অশান্তি আল্লাহর তরফ থেকে দুনিয়াতেই এদের জন্য প্রেরিত আজাব। এই আজাবেই এরা জ্বলে পুড়ে মরুক। আমিন

Categories
ধর্ম

গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে ওয়াজ মাহফিলের গুরুত্ব

মফস্বলে বেড়ে ওঠা ছেলে আমি। ছোটবেলায় ডিসেম্বর আর জানুয়ারি মাসটা ছিল যেন স্বপ্নের মতো দুটো মাস। এই দুই মাসেই ঘটত মজার মজার সব কান্ড- ফাইনাল পরীক্ষা শেষ, নানুর বাড়িতে ঘুরতে যাওয়া, রাতের বেলা ব্যাডমিন্টন, রমাদানের ঈদ, মহল্লায় বন্ধুদের নিয়ে বাড়ি বাড়ি চাল-ডাল উঠিয়ে মা-খালাদের পুরাতন শাড়ি দিয়ে প্যান্ডেল বানিয়ে পিকনিক, নতুন ক্লাসের নতুন বইয়ের ঘ্রাণ, স্কুলের ঢিলেঢালা ক্লাস, বাংলা বইয়ের গল্পগুলোর উত্তেজনা, পিঠেপুলি আর আর অবশ্যই অবশ্যই ওয়াজ মাহফিল। শবে বরাত, শবে ক্বদরের মতো আর একটা রাতই বাড়ির বাইরে ইচ্ছেমতো কাটানোর এক্সেস ছিল, সেটা এই ওয়াজ মাহফিলের রাতগুলোয়। বয়ান ওতো বুঝতাম না, মূল আকর্ষণ ছিলো, প্যান্ডেলের বাইরে হরেক রকম ভাজাপোড়া, মিঠেমন্ডা আর বন্ধুদের নিয়ে দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানো।

মাইকের যথেচ্ছা ব্যবহার, বক্তাদের অসামাঞ্জস্য বক্তব্য, গভির রাত পর্যন্ত চলা কথামালা, অতিরিক্ত বানিজ্যিকীকরণ- এরকম অনেক অভিযোগ উঠলেও স্টিল এই ওয়াজ মাহফিলগুলোই অধিকাংশ মানুষের ধর্মীয় কথা শোনার অনেক সময় একমাত্র সোর্স। এছাড়াও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বুষ্ট করার জন্যও ওযাজ মাহফিলের রয়েছে ব্যাপক গুরুত্ব। নীচে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে ওয়াজ মাহফিল নিযে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ ও কিছু সুপারিশমালা তুলে ধরা হলো।

১। যতই হাস্যকর, যতই আজগুবি উপাদান থাকুক স্টিল বাংলা সিনেমার দর্শকই কিন্তু দেশে সবচেয়ে বেশি। একসময় শুনেছিলাম, মাই টিভির টিআরপি নাকি সবচেয়ে বেশি, কারণ ওখানে সারাদিন বাংলা ছবি চালানো হয়। আপনার কাছে যতই জোকারি মনে হোক, সস্তা কৌতুক মনে হোক, গালগল্প মনে হোক, অসামাঞ্জস্য কথামালা মনে হোক, এইকথাগুলোই কিন্তু গ্রামের মানুষগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো গভীর রাত পর্যন্ত শুনে থাকে ওয়াজ মাহফিলে। এভাবেই বছর পর বছর ধরে ওয়াজ মাহফিল গুলো চলে আসছে। এখন সমস্যা হয়েছে ভিডিওর সহজলভ্যতার কারণে নীলফামারীর গহীন কোন এক গ্রামের মানুষদের সামনে করা ওয়াজ মাহফিলের ভিডিও-ও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই তা আপনার ভাষাজ্ঞান, সাহিত্যজ্ঞানের সাথে কম্প্যাটিবল হচ্ছে না। এ নিয়ে হাসিতামাশা, মশকরা, রাজনীতি করার কিছু নেই। তাদের টিজি আপনি নন। সব মাহফিল কি আপনার দেখতে হবে, সবগুলো নিয়ে সমালোচনা করতে হবে, ছেড়ে দেন না কিছু গ্রামের মানুষের জন্য।

২। ২-৩ ঘন্টার একটি লেকচারে একটানা ধর্মের কথা বললে স্বাভাবিকভাবেই একঘেয়েমি চলে আসে। তখন একটু ডাইনে-বামে বলতে হয়। এখন বলতে পারেন ২-৩ ঘন্টা লেকচার দেয়ার দরকার কি, তখন আবার আয়োজকরা মাইন্ড করে। এতো টাকা দিয়ে আনলাম হুজুর মাত্র এক ঘন্টা ওয়াজ করেই ফুটলো। এতো দীর্ঘ সময় কথা বললে কিছু হাসিতামাশা করতেই হয়, ভুলভাল হওয়া স্বাভাবিক, আমাদের নিজেদেরও তো হয়, । ইউটিউব বা ফেসবুকের খন্ডিত ক্লিপ বা রোষ্টিং ভিডিও দেখে হুজুরদের পচানোর কিছু নেই। শরীয়াহর বিরুদ্ধে না গেলে এসব নির্দোষ কৌতুকে দোষের কিছু নেই। গ্রামের লোক এগুলোতেই মজা পায়।

৩। গ্রামের মানুষজন সারাদিন কাজেকর্মে ব্যস্ত থাকে। শীতকালে মাগরীবের পরপরই ঈশার ওয়াক্ত শুরু হয়ে যায়। তাই কোন বক্তার নিবরচ্ছিন্ন ওয়াজ করার একমাত্র অপশন হলো ঈশার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। এইসময়ই বেশি লোকসমাগম হয়। আমি দিনে অনেক ওয়াজ মাহফিল দেখেছি, মাছি মারার লোকও পাওয়া যায় না। কে চায় তাদের প্রোগ্রামটিকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করতে।

৪। গ্রামের প্রায় শতভাগ মসজিদে মহিলাদের প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পুরুষেরা তা-ও সপ্তাহান্তে জুমার সালাতে কিছু ঈমানী কথা শোনার সুযোগ পায়, কিন্তু মহিলাদের এরকম সুযোগ নেই বললেই চলে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে প্রায় প্রতিটি ওয়াজ মাহফিলেই মহিলাদের জন্য ওয়াজ শোনার ব্যবস্থা থাকে। ধরা যায়, এই ওয়াজ মাহফিলগুলোই মহিলাদের ঈমানী কথা শোনার একমাত্র সোর্স। কোন গ্রামে ওয়াজ মাহফিল হলে ওই গ্রামে থাকা লোকজনের বাড়িতে ওই কয়দিন আত্মীয়দের আনাগোণা শূরু হয়। দূরদুরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন বিশেষ করে মহিলারা বেড়াতে আসে ওয়াজ মাহফিল শোনার জন্য । এধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

৫। অধিকাংশ ওয়াজ মাহফিলের উদ্যোক্তা সাধারণত ইয়াতিমখানা বা মাদ্রাসা গুলো হয়ে থাকে। মাহফিলকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসাগুলোয় এককালীন একটা বড় ফান্ড কালেক্ট হয় বা বড় কোন কাজ (যেমন: বিল্ডিং বা ওযু খানা) এর এন্তেজাম হয়। যদি এরকম কিছু না-ও অর্জন হয় এট লিষ্ট প্রচার প্রচারণা হয়। অধিকাংশ মাদ্রাসা থাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে। এই মাহফিল গুলোর কারণে মানুষজন তাদের অস্তিত্বের জানান পায়।

৬। শুধু মাদ্রাসাগুলোই নয় ওয়াজ মাহফিলের দিনগুলোতে পুরো গ্রামের অর্থনীতি-ও সামগ্রিকভাবে বুষ্ট আপ হয়। ছোট ছোট ব্যবসাগুলোর ফ্লাশ সেলের সুযোগ এনে দেয় এই মাহফিলগুলো। কিছু কিছু ব্যবসায়ই তৈরী হয় মাহফিলগুলোকে কেন্দ্র করে। মাহফিল যেখানে ব্যবসা সেখানে।

৭। শহরে প্যান্ডেলের বাইরে মাইক ব্যবহারের ঘোর বিরোধি হলেও গ্রামে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাবলিক ডিমান্ড থাকে মাইক দূর-দূরান্তে বসানোর। বিশেষ করে বেশি মাইক থাকলে মহিলারা ঘরে বসেই ওয়াজ শুনতে পারে। বিষয়টি গ্রামের মানুষদের পরামর্শের উপর ছেড়ে দেয়া যেতে পারে।

৮। বাকি থাকলো বক্তাদের অর্থদাবীর বিষয়টি। ভাইরে এটা মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগ। হুজুররাও কি এর বাইরে। যে বেশি মাহফিল জমাতে পারে, যে বেশি জনপ্রিয়, যার বক্তব্য শুনতে শ্রোতারা দূর-দুরান্ত থেকে ছুটে আসে তার ডিমান্ড বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রায় তিন চার মাস আগে শুনেছি, এই সিজনে আজহারী হুজুরের শিডিউল নাকি ফুল প্যাক্ড। মানে নতুন করে তাকে বুক করার কোন সুযোগ নেই। নেক্সট ইয়ারের জন্য বুকিং দিয়ে রাখতে হবে। এখন আজহারী হুজুরের ডিমান্ড অন্যদের মতো হবে না এটাই স্বাভাবিক। হুজুরদেরকে এই পরিমাণ অর্থ দিয়েও কিন্তু অর্গানাইজাররা লাভের মধ্যে থাকে। এটা তাদের মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর বিষয়।

মুসলিম অধ্যুষিত এই ভূখন্ডে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে স্তমিত করার জন্য সর্বব্যাপি প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে। যত্রতত্র যেখানে সেখানে গড়ে ওঠা এই মানহীন মাদ্রাসাগুলো, গ্রামে-গঞ্জে গভীর রাতে চলা এই ওয়াজ মাহফিলগুলোই দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মাঝে ইসলামের আলোকে নিভু নিভু জ্বালিয়ে রেখেছে। বক্তাদের শরীয়তবিরোধি কথা নিয়ে বিরোধিতা হতে পারে, চাপাবাজি, মিথ্যাচার নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, মাইকের যথেচ্ছা ব্যবহার নিয়ে নসিহাহ দেয়া যেতে পারে, কিন্তু ঢালাওভাবে ওয়াজ মাহফিলের বিরুদ্ধে, বক্তাদের বিরুদ্ধে, সর্বোপরি মাহফিলগুলো বন্ধের বিষয়ে ইসলামবিরোধিদের যে প্রচারণা, প্রচেষ্টা, সেই চেষ্টার গুড়ে বালি ঢেলে দিতে হবে। মাহফিলের আয়োজক ও বক্তাদেরও যৌক্তিক সমালোচনা বিবেচনায় নিয়ে সে অনুযায়ি পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে করে মাহফিলের উপর কেউ আঘাত হানতে না পারে। বেঁচে থাকুক এই মাহফিলগুলো, আল্লাহর ওয়াদা- ইসলামের নূরকে পূর্ণরুপে প্রজ্জ্বলিত করবেন, সেই ওয়াদার পেছনে উৎস হিসেবে কাজ করুক, মাহফিলগুলো। আমিন।

Categories
ধর্ম

ইসলামী সাহিত্য

শুরুটা করেছিলো সিয়ান। এদেশের ইসলামী সাহিত্য নিয়ে ছিলো বিস্তর অভিযোগ। প্রিন্ট কোয়ালিটি খারাপ, বাঁধাই খারাপ, কন্টেন্ট পড়ার মতো না, লেখকদের ঠিকমতো পারিশ্রমিক না দেয়া- এরকম অংখ্য অভিযোগের ভান্ডার ছিলো তাদের বিরুদ্ধে। একদল উদীয়মান, শক্তিশালী লেখক, সংগঠকের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে সিয়ান। ঝকঝকে প্রিন্ট, অসাধারণ কাগজ, শক্তিশালী বাঁধাই, অনন্য সাধারণ কন্টেন্ট, লেখক-প্রকাশক সুসম্পর্ক- এরকম অসংখ্য প্রতিশ্রুতি নিয়ে সামনে আসে সিয়ান। দেশের ইসলামী সাহিত্যের অঙ্গনে একরকম বিপ্লব শুরু করে তারা। সিয়ান কর্তৃক যে বীজটি বোপিত হয়েছিলো, তা এখন বলা চলে মহীরুহ বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। ইসলামী বই মানেই যেমন অন্তরের শান্তি, সাথে চোখেরও প্রশান্তি। কি বাঁধাই, কি প্রিন্ট, কি কন্টেন্ট সবজায়গায় বিপ্লবের ছোঁয়া।

ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি, ইসলামী লোকজন প্রতিক্রিয়াশীল, অন্ধ, যুক্তি মানে না, বিজ্ঞানবিমুখ। আল্লাহর কি শান, এই এক জীবনেই পাশার দানটা পুরো উল্টে যাওয়ার সাক্ষি করে দিলেন। যে লোকগুলো আজীবন মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধি, বিজ্ঞানচর্চার মন্ত্র জপেছে তারাই আজ বলছে, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাইনটিস্ট হলেই বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া যায় না, মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধির ধারক এই লোকগুলোকে দেখেছি কিভাবে আরিফ আজাদের বইকে নিষিদ্ধ করা যায় সেই পায়তারা করতে। এরাই একসময় আমাদের শিখিয়েছে, কলমের জবাব কলম দিয়ে দিতে, লেখার জবাব লেখা দিয়ে। এখনতো কলম আর লেখার স্রোতে ধুতি খুলে যায় অবস্থা। তাই নিয়েছে ভিন্নপথ, যার অভিযোগ তারা অন্যদের বিরুদ্ধে তুলতো এতোদিন।

খবর পুরনো, গতবছরের মতো এবছরও কোন ইসলামী প্রকাশনিকে বইমেলায় স্থান দেয়া হয় নি। রকমারীর বেষ্ট সেলার প্রকাশনা ‘সমকালীন’, ‘গার্ডিয়ান’ এবারও ‘ভাড়া বেচে খাওয়া’ প্রকাশনীর স্টলে জায়গা করে নিয়েছে। আরিফ আজাদের বইকে চট্টগ্রাম বইমেলায় ঢুকতে দেয়া হয় নি।

পিনাকি দা একবার বলেছিলেন, সেক্যুলার রাইটাররা যেখানে চিন্তায় পড়ে যায় এবার কি ২০০ কপি ছাপাবে নাকি ৩০০, সেখানে যেকোন ইসলামী বইয়ের প্রকাশনা শুরুই হয় ৫০০০ কপি দিয়ে!

কোন মাত্রায়ই এই মিসকিনগুলা আর ইসলামী বইয়ের সাথে তুলনার ধারে-কাছে নেই। মুদ্রণ কোয়ালিটি, বাধাই, কনটেন্ট, মুদ্রণ সংখ্যা, পাঠক সংখ্যা, আন্তর্জাতিক ব্যাপ্তি- যোজন যোজন এগিয়ে গেছে দেশের ইসলামী সাহিত্য এই ক’বছরে। বইমেলা /বাংলা একাডেমী যদি এই স্রোতের অনুকূলে পাল তুলতে না পারে, তবে সময়ই বলে দিবে তাদের গন্তব্য!

Categories
ধর্ম

করোনাত্তোর অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় ইসলামী সমাধান

২০০৮-০৯ সালের দিকের কথা। ইউএস ইকোনমিতে চলছে রেসেশন। সেসময় একটা প্ল্যাকার্ডের কথা এখনো মনে আছে- একটা শপিং মলের বাইরে লেখা ছিল, “Please buy a shirt and save the economy”. যতোই QE করেন, প্যাকেজ ঘোষণা দেন, ইকোনমিকে বাচাতে হলে নাগরিকদের খরচ করার কোন বিকল্প নেই। টাকা রোলিং করতে হবে, যত খরচ হবে, টাকার যত হাতবদল হবে, টাকার মান তত বাড়তে থাকবে।

আমাদেরই জীবদ্দশায় আরও একটি রেসেশন হাজির প্রায় এবং আরও বড় আকারে, পুরো বিশ্ব আক্রান্ত হতে যাচ্ছে। দুঃচিন্তায় বেচারা জার্মান এফএম তো সুইসাইডই করে ফেললো! ০৮-০৯ এ আমরা বেঁচে গেছিলাম, এবার যে কি অবস্থা হয়, আল্লাহই জানেন। এ্যামেরিকা, কানাডা তার নাগরিকদের জন্য প্যাকেজ ঘোষণা করে দিয়েছে। আমাদের ঘটে তো সেই ভাগ্য নেই। লক ডাউন খুললে সবার প্রথম কাজ হবে খরচ করা, প্রচুর খরচ করা। যত বেশি খরচ করবেন তত বেশি কনট্রিবিউশন হবে ইকোনমিতে। নিজের জন্য খরচ করুন, অন্যের জন্য খরচ করুন, প্রয়োজনে খরচ করুন, অপ্রয়োজনে খরচ করুন। খরচ করুন, ইকোনমিকে বাঁচান। সঞ্চয় করার সময় নয় এটা।

আমরা হুজুররাতো সব জায়গায় ইসলাম টেনে আনি। কি করবো, সব সমস্যার প্রোপার সলুশন তো ইসলামেই পাওয়া যায়। এই যে লক ডাউন চলতেছে, কই পাইলেন? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাহিসসালাম ১৪০০ বছর আগে বলছেন মহামারী এলাকা থেকে কেউ বেরও হবা না, ওইখানে কেউ যাবাও না। আপনারাই পাকনামি করে আলগা দরদ দেখাইতে যায়া রোগ টেনে আনলেন, এখন ১৬ কোটিরে লক ডাউন করে রাখছেন। আরেকদল পাকনা লোকজন আছে, জজবা দেখাইতে যায়া রসূলের নির্দেশ অমান্য করে ধর্মীয় গ্যাদারিং করছে, এখন বুজুক ঠ্যালা। করোনাও সামলাও, মামলাও সামলাও।

যাইহোক অন্য লাইনে চলে যাচ্ছি। খরচ করার ব্যাপারে তিনটি হাদিস দিয়ে দিলাম। এখানে খরচ করাকে যদি সদাকা অর্থেও নেন, আরেক হাদিস থেকে সাব্যস্ত হয়, নিজের পরিবারের জন্য খরচ করাও সদাকা। অতএব অন্যের জন্য না হলেও এই হাদিসগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের পরিবারের জন্য হলেও খরচ করুন।

“একবার হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত বেলাল (রাঃ) এর নিকট গেলেন , তাঁহার নিকট খেজুরের একটি স্তূপ রাখা ছিল । হুযুর (সাঃ) বলিলেন, ইহা কি ? তিনি বললেন , ভবিষ্যতের প্রয়োজনের জন্য রাখিয়ে দিয়াছি । এই কথা শুনে নবীজি (সাঃ) বললেন , হে বেলাল, তুমি কি ভয় কর না যে , জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ইহার ধোঁয়া দেখিতে পাইবে ? খুব খরচ করো এবং আরশের মালিকের নিকট কম হওয়ার ভয় করিও নাহ।”

“হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বলেন , হুযুর (সাঃ) এরশাদ করেন , প্রতিদিন সকালে দুইজন ফেরেশতা আল্লাহ্‌ তায়ালার নিকট দোয়া করেন । একজন দোয়া করেন , ” হে আল্লাহ্‌, খরচকারি ব্যাক্তিকে উহার বিনিময় দান কর। আর একজন দোয়া করেন , ” হে আল্লাহ্‌ , যে ব্যাক্তি জমা করিয়া রাখে , তাহার সম্পদ ধ্বংস কর। “

“হযরত আসমা (রা:) বলেন , হুযুর (সাঃ) আমাকে এরশাদ করিয়াছেন , খুব খরচ কর , গনিয়া গনিয়া রাখিও নাহ ,তাহলে আল্লাহ্‌ তায়ালাও গনিয়া গনিয়া দান করিবেন । জমা করে রেখো নাহ তাহলে আল্লাহ্‌ও তোমাকে না দিয়া জমা করে রাখিবেন । দান করিতে থাক । যত পরিমাণ তোমার দ্বারা সম্ভব হয় ।”

Categories
ধর্ম

“কি রে রোহিঙ্গা, কি খবর” ও করোনা মহামারী

“কি রে রোহিঙ্গা, কি খবর”- কিছুদিন আগেও খুব পপুলার একটা ডায়ালগ ছিলো এদেশে। বলতে দ্বিধা নেই এই ডায়ালগদাতাদের অধিকাংশই রিক্সাওয়ালা, শ্রমিক, বাসের হেল্পার, ড্রাইভার, দিনমজুর শ্রেণির লোকজন। এদের সাথে ছিল কিছু বিবেকবিকৃত, মগজবিক্রিত কিবোর্ড যোদ্ধা। রোহিঙ্গা শব্দটিকে রীতিমতো গালি বানিয়ে ফেলেছিলো তারা। রোহিঙ্গারা এদেশে উন্নত জীবনের আশায় আসেনি। অসভ্য বর্বর বার্মিজ সেনাবাহিনী ও জঙ্গি বুদ্ধিস্টদের হাত থেকে প্রাণ বাচাতে নিতান্ত মাথাগোঁজার ঠাঁইয়ের জন্য তাদের এদেশে আসা। তাদের নিদারুণ জীবনযন্ত্রণায় সমব্যাথি হয়ে দেশের বিবেকবান জনগোষ্ঠি যখন সাধ্যমতো তাদের পাশে দাড়িয়েছিলো, তখনই একটা শ্রেণির মকারী অন্তঃপীড়ার কারণ হয়ে দাড়িয়েছিল।

সেসময় টেকনাফ, কক্সবাজারে বেশ কয়েকবার যাবার সুযোগ হয়েছিল ত্রাণ নিয়ে। কাজ করেছি শাহপরির দ্বীপের ফার্স্টহ্যান্ড রেসকিউ টিমের সাথে, যারা নাফ নদী পেরিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে পৌছে দিচ্ছিল। ত্রাণের জন্য রোহিঙ্গাদের রাস্তায় বসে থাকা, ত্রাণের গাড়ি আসলে হুটোপুটি, লুটপাট খুব পরিচিত দৃশ্য ছিল তখন। মাত্র ২-৩ বছরের ব্যবধানে খোদ ঢাকা শহরে বসে এই দৃশ্য দেখতে হবে তা ছিল দূরতম কল্পনারও অতীত। সেসময় রোহিঙ্গাদের নিয়ে মকারি করা জনগোষ্ঠীই এখন ভিকটিম। জানিনা আরও কতদিন এ দৃশ্য দেখতে হয়।

তবে এপার্ট ফ্রম মকারি রোহিঙ্গাদের প্রতি এদেশের মানুষ যে সহমর্মিতা, সহানুভূতি দেখিয়েছে এবং যেভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো তা ছিল এককথায় অভূতপূর্ব। নিজের ভালো আমলের উছিলা দিয়ে নাকি দু’আ করা যায়। “হে আল্লাহ, সেসময় রোহিঙ্গারা যেরকম অসহায় ছিল, আজ আমরা সেরকম অসহায়, তাদের পাশে দাড়ানোর জন্য আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি, আজকের এই মহাদুর্যোগের সময় দয়া করে আপনি আমাদের পাশে থাকুন, আপনি আমাদের রক্ষা করুন। আপনি পরম রক্ষাকারী। এ জনপদে আপনার শোকরগুজারি জনগণের সংখ্যা অনেক, দয়া করে আপনি আমাদের পাকড়াও করবেন না মা’বুদ। আমাদেরকে আপনার রহমতের সুশীতল ছায়াতলে স্থান দিন। সেই সাথে মানুষের অসহায়ত্ব, দুর্বলতা নিয়ে যাতে হাসিতামাশা কখনও না করি সেই শিক্ষা আমাদের দিন। আমিন, ইয়া রব্ব!”

Categories
ধর্ম

মাথা ন্যাড়ার ফতোয়া ও মুসলিম প্রোডাক্টিভিটি

দাবা খেলা জায়েজ কিনা দুইদিন আগে একটু ঘাটাঘাটি করলাম। অনেক গুলো মত পেলাম, একদল আলেম ডিরেক্ট হারাম বলেছেন, কেউ কেউ মাকরুহ। ঘাটতে যেয়ে ড. ইসরার আহমেদের একটা ছোট্ট ভিডিও পেলাম, উনি হালাল হারাম কোনকিছুই বলেন নি, কিন্তু উত্তরটা খুবই চমৎকার লেগেছে! প্রশ্নকর্তাকে উনি বললেন, দেখো বেটা এটা হালাল কি হারাম আমি সেইদিকে যাবো না, কিন্তু কথা হলো একজন মুসলিমের কি এইসব অনর্থক কাজে সময় নষ্ট করার মতো সময় আছে?! মুসলিমের জন্য রয়েছে অনন্তকালের আখিরাত, এবং সেটি পাওয়ার শস্যক্ষেত্র হলো দুনিয়া। এই দুনিয়ার প্রতিটি মুহুর্ত হলো গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়গুলোর গুরুত্ব যদি কেউ বুঝতো তাহলে এইসব অনর্থক কাজে কেউ এক বিন্দু সময়ও নষ্ট করতো না। উর্দু বুঝলে ইউটিউবে Chess and games in islam- Dr. Israr Ahmed লিখে সার্চ দিয়েন। অন্তরে দাগ কাটবে। খুবই দরদভরা গলা।

এই উত্তরটা আমাকে বিল্লাল ফিলিপসের সেই অমর বানীটি মনে করিয়ে দিলো, “একজন মুসলিম যদি জানতো তার কতো কাজ বাকি, তাহলে তার উইকএন্ড, ছুটি, টাইমপাস বলে কিছু থাকতো না”।

আমাদের দাঈ, আলেম ওলামা যারা রয়েছেন তারা যদি ইসলামের এই এসেন্সটা শেখানোর উপর জোর দিতেন তাহলে আপনাদের অনেক কাজ সহজ হয়ে যেত। দুইদিন পর পর বিভিন্ন ট্রেন্ডে আপনাদের হালাল হারামের ফতোয়া নিয়ে হাজির হতে হতো না। কে ফেস এ্যাপ ইউস করলো না মাথা ন্যাড়া করলো সেখানে যেয়ে যেয়ে ফতোয়া পোষ্ট করতে হতো না।

এইসব ট্রেন্ডি ইস্যুতে হালাল হারামের বাইরে অনেক গ্রে জোন আছে, যেমন এই মাথা ন্যাড়ার ইস্যুটাই ধরি,আমি নিজে ন্যাড়া করেছি। একমাস ধরে সেলুন বন্ধ, বাইরে যাওয়া বন্ধ, বাসায় ট্রিমার দিয়ে কাটতে যেয়ে দেখি ব্যাড়া ছ্যাড়া অবস্থা, বাধ্য হয়ে ফেলে দিলাম। ফেলে দিয়ে দেখলাম খুব ভালো হয়েছে, মাথায় খুশকি হয়ে খাবলা খাবলা হয়ে গিয়েছিল। এই সুযোগে মাথার স্কিনটাও মেরামত হলো, চুল কাটারও ঝক্কি থাকলো না। আমার কাছে মনে হয়েছে অধিকাংশই এই দুই কারণে ন্যাড়া করছে, এক চুল কাটানোর ঝামেলা, দুই স্কিন প্রবলেম। এখন আমার কাছে যখন এই মাথা ন্যাড়ার ফতোয়া হাজির হয়, স্বাভাবিকভাবেই বিরক্তির উদ্রেক ঘটায়। আরেকদল আছে, যারা হুজুগে করতেছে, এদের কাছে এইসব ফতোয়া মূল্যহীন। আর কেউই হারাম কিছু করতেছে না। আপনাদের কাছে কেনো মনে হচ্ছে, মানুষ মহামারী থেকে বাচার জন্য হতাশ হয়ে চুল ফেলে দিচ্ছে!

এরচেয়ে মানুষকে ইসলামের এসেন্স শেখানোর দিকে গুরুত্ব দিন, আপনাদের অনেক কাজ সহজ হবে। ট্রেন্ড বাই ট্রেন্ড ফতোয়া ইস্যু না করে মানুষকে তার সময়ের মূল্য সম্বন্ধে সচেতন করুন, তাকে শেখান তার কত কিছু করার বাকি আছে? খেলাধুলা হালাল কি হারাম, ফেসএ্যাপ কি ইউস করা যাবে কিনা, মিউজিক করা যাবে কিনা- সে নিজেই বুঝে যাবে! আপনারই বা এতো সময় কোথায় এইসব ট্রেন্ডের পেছনে ছোটার, সেটার ইসলামিক ব্যবচ্ছেদ করার। আমাদের কেন প্রতিটা ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে, প্রতিক্রিয়াশীল গালি খেতে হবে। সময় পাল্টেছে, ক্রিয়াশীল হোন, কাজ করুন, অগ্রগামী হোন, অপজিশনকে প্রতিক্রিয়াশীল বানান। তারা চেয়ে চেয়ে দেখুক মুসলিমদের কর্মকান্ড। অনেক কাজ বাকি ভাইয়েরা। এই সময়ের মূল্য দিন।

Categories
ধর্ম

নফল রোজা

সিয়াম বা রোজা রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আ’মাল। এতে একদিকে যেমন মানসিক আত্মশুদ্ধি অর্জন ও কুপ্রবৃত্তি দমন হয় তেমনি শারিরীক দিক দিয়েও রোজা অনেক উপকার বয়ে আনে। জাপানিজ বিজ্ঞানি Yoshinori Ohsumi ২০১৬ সালে ‘অটোফেজি’র উপর গবেষণা করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পান। এককথায় অটোফেজি হলো দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকার মাধ্যমে অর্জিত সেই শরীরবৃত্তীয় অবস্থা যখন শরীরের কোষগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ ক্ষতিগ্রস্ত কোষ, প্রোটিন, বিষ ভক্ষণের মাধ্যমে শরীরকে ঝরঝরে ও প্রাণবন্ত করে গড়ে তোলে। মুসলমানেরা এই অটোফেজির চর্চা করে আসছে রোজার মাধ্যমে সেই ১৪০০ বছর ধরে। ইসলামে রোজা রাখাকে খুবই উৎসাহিত করা হয়েছে। রমাদ্বানে পুরো একমাস ফরজ রোজার পাশাপাশি বছর জুড়ে রয়েছে নফল রোজার অনেকগুলো স্কিম। আসুন সংক্ষেপে সেই নফল রোজার স্কিমগুলো দেখে নেইঃ

১. শাওয়াল মাসের ছয় রোজা। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা,) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখার পরপর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখবে, সে যেন পুরো বছর রোজা রাখল।’ (মুসলিম)

২. প্রতি মাসে তিনটি রোজা। প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোজাকে হাদিসে সারা বছর সিয়াম পালনের সমতুল্য বলা হয়েছে। (আবু দাউদ)
আবু হুরায়রাহ (রা.) বলেন, আমার বন্ধু মুহাম্মদ (সা.) আমাকে তিনটি আমলের উপদেশ দিয়েছেন_ ক. প্রতি মাসে তিনটি রোজা; খ. দুই রাকাত সালাতুদ্দোহা বা চাশতের নামাজ এবং গ. রাতে ঘুমানোর পূর্বে বিতর নামাজ পড়া। (বুখারি ও মুসলিম)

৩. প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবারের রোজা। রাসূল (সা.) বলেন, সোম ও বৃহস্পতিবার আমলগুলো উপস্থাপন করা হয়। আমি চাই আমার আমল সিয়াম পালন অবস্থায় উপস্থাপন করা হোক। (তিরমিজি)

৪. আরাফার দিবসের রোজা। এ দিবসে রোজা রাখার ব্যাপারে রাসূলকে (সা.) প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটা তো আগের ও পরের দুই বছরের পাপ মুছে দেয়। (মুসলিম)

৫. আশুরার রোজা। মহররমের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। হাদিসে এসেছে, এই দিন রোজা রাখলে পূর্বের এক বছরের পাপ মোচন হয়। (মুসলিম) কিন্তু ইহুদিরা একই দিনে রোজা পালন করত বিধায় সাহাবারা এই দিন রোজা রাখার ব্যাপারে আপত্তি জানালে রাসূল (সা.) বললেন, আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তাহলে মহররমের ৯ তারিখেও রোজা রাখব। (মুসলিম) সুতরাং মহররমের ৯ ও ১০ উভয় তারিখেই রোজা উচিত, যেন ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য না থাকে।

৬. একদিন পরপর রোজা রাখা। দাউদের (আ.) নিয়ম ছিল, তিনি একদিন পরপর রোজা রাখতেন। হাদিসে এসেছে, আল্লাহর কাছে (নফল) রোজাগুলোর মধ্যে এই নিয়মে রাখা রোজাই শ্রেষ্ঠ রোজা। (বুখারি ও মুসলিম)

৭. জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিনের রোজা। হাদিসের ভাষ্য, জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমলের চেয়ে অন্য কোনো আমলই আল্লাহর কাছে এত বেশি প্রিয় নয়। (আবু দাউদ) সে হিসেবে এ মাসের প্রথম ৯ দিন সিয়াম পালনের ফজিলত অনেক। উল্লেখ্য, এ মাসের ১০ তারিখ যেহেতু ঈদুল আজহা, সেহেতু এ দিন রোজা রাখা হারাম। আর এ মাসের ৯ তারিখই হলো আরাফার দিন।

৮. শা’বান মাসের রোজা। হাদিসে এসেছে- রাসূল (সা.) রমজানের পর শা’বান মাসেই বেশি সিয়াম পালন করতেন।

৯. অবিবাহিতদের রোজা। রাসূল (সা.) বলেন, যাদের বিয়ে করার সামর্থ্য আছে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে চক্ষুকে নিম্নগামী রাখতে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজতে রাখতে অধিক সহায়ক। কিন্তু যারা বিয়ের (আর্থিক) সামর্থ্য রাখে না, তারা যেন সিয়াম পালন করে। কেননা, সিয়াম হলো (পাপ থেকে বাঁচার) ঢালস্বরূপ। (বুখারী)

আজকে সোমবার থেকে নিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টানা চারটা রোজা রাখলে আমরা একই সাথে সাপ্তাহিক দুটি রোজা এবং মাসিক তিনটি রোজা অর্থাৎ শা’বান মাসের ১৩,১৪,১৫ তারিখ রোজা রাখার সৌভাগ্য অর্জন করবো। উপরের আলোচনা থেকে আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি রমাদ্বান বাদে এই শা’বান মাসেই নবীজি (সা.) সবচেয়ে বেশী রোজা রাখতেন। তাই আসুন রমাদ্বান আসার পূর্বেই এই রোজাগুলো পালনের মাধ্যমে আমরা রমাদ্বানের জন্য প্রস্তুত হই এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার জন্য সচেষ্ট হই। মহান আল্লাহ আমাদের এই রোজাগুলো রাখার মতো মানসিক ও শারিরীক শক্তি দান করুন। আমিন।

Categories
ধর্ম

গ্রীণটেক কুর’আন এ্যাপ রিভিউ!

কুরআন অধ্যায়নের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে দুই ধরণের প্রান্তিকতা দেখা যায়। একদল অর্থসহ কুরআন পড়ার ব্যাপারে মোটেই আগ্রহী না, প্রতি হরফে দশ নেকি করে নিয়েই তারা সন্তুষ্ট থাকতে চায়, আল্লাহ আমাদেরকে কি বলতে চায় সেটা নিয়ে এদের কোন মাথাব্যথা নেই। এদের অনেকে এই আক্বিদাও পোষণ করে, কুরআন বুঝে পড়লে গুমরাহ হয়ে যাওয়ার চান্স আছে, আ’উযুবিল্লাহ।

আরেকদল আছে যারা কুরআনের স্পিরিচুয়াল বা আধ্যাত্মিক ব্যাপারটাকে অবহেলা করে শুধু বোঝা বা অর্থ পড়ার ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। কুরআন মুখস্থ বা তিলাওয়াত তাদের কাছে একদমই গুরুত্ব পায় না। অনেকে তো দশ নেকির বিষয়টি নিয়ে অপর গ্রুপকে তাচ্ছিল্যও করতে থাকে।

কুরআন এমন একটা কিতাব যা বুঝে পড়া যেমন জরুরি তেমন এর আধ্যাত্মিক আবেদনটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কুরআনের অধ্যায়নে অন্তরে যে প্রশান্তি আসে বা একটি সুমধুর তিলাওয়াত হৃদয়ে যে ঝঙ্কার তুলে, কোনকিছুর সাথে সেটা তুলনীয় নয়! কুরআন বুঝে পড়ার গুরুত্ব নিয়ে কোন দ্বিমত নেই, কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে আমরা কুরআন মেমোরাইজেশনের দিকে একটু কম গুরুত্ব দিয়ে ফেলছি। আমি কোন ফজিলতের দিকে যাবো না, কোরআন মেমোরাইজেশনের শুধু তিনটা উপকারিতা বলছিঃ

ক) নতুন নতুন সূরা দিয়ে নামাজ পড়লে মজাও যেমন পাবেন তেমনি নামাজে মনোযোগও অনেক বৃদ্ধি পাবে।
খ) তাহাজ্জুদ সালাত দীর্ঘ করার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ পাবেন।
গ) কুরআন ছাড়া কোথাও থাকতে হলে মুখস্থ থাকার কারণে কুরআনের সংস্পর্শে থাকতে পারবেন।

কুরআন মেমোরাইজেশনে মোটিভেট করার জন্য আর কোন বড় কারণ দরকার আছে বলে আমার কাছে মনে হয় না। প্রতিটা রমাদান একেকটি বড় সূরা মুখস্থ করার জন্য খুবই উপযুক্ত সময়। এসময় শয়তান বন্দী থাকে, কুরআন অধ্যায়ন করা অনেক সহজ হয়ে যায়।

দুই ধরণের প্রান্তিকতা পরিহার করে কুরআন বুঝে পড়া ও মুখস্থ করা সহজতর করার জন্য খুবই কার্যকরী একটা এ্যাপের সন্ধান দিবো আজকে। গ্রীণটেক এর কুরআন এ্যাপ। এই এ্যাপ নিয়ে যদি এককথায় মূল্যায়ন করতে চাই, তবে বলবো, একটা কুরআন এ্যাপে আপনি যে-ধরনের ফিচারগুলো খুজেন বা স্বপ্নের মতো কোন এ্যাপের মধ্যে যে ফিচারগুলো চান তার প্রায় প্রতিটিই পাবেন এই এ্যাপে।

ঝকঝকে এ্যারাবিক ফন্ট, ট্রান্সলেশন, তাফসির, ওয়ার্ড বাই ওয়ার্ড মিনিং, বিভিন্ন ক্বারীদের তিলাওয়াত- কি নেই এতে। বুকমার্ক করা, নোট রাখা নাইটমোডসহ বিভিন্ন মোড, আয়াত দিয়ে, সূরা নম্বর দিয়ে, পারা দিয়ে সার্চ করা এই অপশনগুলো তো আছেই। এই এ্যাপের অনন্য দুইটা ফিচার হলো কুরআনের সবগুলো দু’আ একসাথে এক জায়গায় পাবেন আর কুরআনের ইনডেক্স। কুরআনের ইনডেক্স নিয়ে বাংলাদেশে একটা কাজ হয়েছে, মু’জামুল কুরআন। অনেক বড় কলেবরের এই জিনিস দেখলাম এই এ্যাপে একদম ফিঙ্গার টিপের ভেতর।

কুরআনের ইনডেক্স হলো, ধরেন আপনি জানতে চাচ্ছেন অ্যালকোহল নিয়ে কুরআনের কোথায় কি বলা আছে। অ্যালকোহল সেকশনে গেলে সব আয়াত সেখানে পেয়ে যাবেন। এরকম ওয়ার্ড ধরে ধরে ইনডেক্সিং করা। খুবই অসাধারণ এবং বি-শা-ল একটি কাজ এটি। এই এ্যাপের মধ্যে পাবেন এটি। সম্পূর্ণ এ্যাডমুক্ত এই এ্যাপটি। কুরআন পড়ার মাঝে কোন অযাচিত এ্যাড এসে আপনার মনোযোগ নষ্ট করবে না বা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলবে না।

এই এ্যাপের সাথে যুক্ত প্রতিটি ভাইকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন। এঁনাদের জন্য রীতিমতো হিংসা হচ্ছে! কি একটা জিনিস বানিয়ে ফেলেছে, সুবহানাল্লাহ! এই এ্যাপে ভাষাই রয়েছে ১৬ টি, এক বাংলারই ট্রান্সলেশন/তাফসীর রয়েছে ৫ টি, এ্যারাবিক ফন্ট পাবেন কয়েক ধরনের, ক্বিরাত পাবেন অসংখ্য ক্বারীর।

এখন বলছি এই এ্যাপ কিভাবে কুরআন মুখস্থ করা ও বুঝে পড়া সহজতর করে দিবে। ওয়ার্ড বাই ওয়ার্ড মিনিং বাংলা সেট করে নিবেন, ইংলিশ তাফসীর বাংলা তাফসীর আছে, পছন্দেরগুলো নামিয়ে নিবেন, একই সাথে অনেকগুলো তাফসীর দেখতে পারবেন, পছন্দের ক্বারীর অডিও নামিয়ে নিবেন। এরপর প্রতিটা আয়াত ধরে ধরে শুরু হবে আপনার কাজ। প্রথমে নিজে কয়েকবার রিডিং পড়বেন, এরপর অডিও শুনবেন কয়েকবার লুপ করে, এতে ত্বিলাওয়াত শুদ্ধ হবে, এরপর ওয়ার্ড বাই ওয়ার্ড অর্থ দেখে নিবেন, সাথে তাফসীর দেখে নিবেন কয়েকটা। এরপর শুরু করবেন মুখস্থ করার কাজ, বাই দিস টাইম আয়াতটা অন্তরে গেঁথে যাবে, মুখস্থ করা সহজতর হবে। এতে একইসাথে কতগুলো কাজ হচ্ছে দেখেনঃ

ক) কুরআন মুখস্থ হচ্ছে
খ) ত্বিলাওয়াত শুদ্ধ হচ্ছে
গ) ওয়ার্ড বাই ওয়ার্ড অর্থ জানতে পারছেন, যা পরবর্তীতে নিজে থেকেই অর্থ বুঝতে সহায়তা করবে।
ঘ) আয়াতের প্রেক্ষাপট, হুকুম আহকামগুলো জেনে যাচ্ছেন।

কুরআন আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে এই দুনিয়ার বুকে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামত। এই কুরআন অধ্যায়ন করা আল্লাহ পাক আমাদের জন্য সহজ করে দিন। আমিন