Categories
ব্যবসা ও অর্থনীতি

“আমনামা : অনলাইনে আম বিক্রির সমস্যা, সম্ভাবনা”

ভূমিকা:

বছর ঘুরে আবারও এসেছে মধু মাস। আম, লিচু, কাঠাল, জামসহ হরেক রসালো ফলের আগমন ঘটে এসময়ে। ফলপ্রেমীদের সকলেই বছর ধরে এসময়ের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। সরাসরি গাছ থেকে ফল পেড়ে খেতে অনেকেই এসময় পাড়ি জমান গ্রামের বাড়িতে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এসময় গ্রীষ্মের ছুটি নামে একটা লম্বা বন্ধ দেয়া হয়। যাদের নগরের বাইরে যাবার সুযোগ হয় না তাদের জন্য ফল ব্যবসায়ীরা নিয়ে বসেন নানা ধরনের মৌসুমি, তাজা ফলের পসরা। অফলাইনে প্রথাগত ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বিগত কয়েক বছরে শুরু হয়েছে অনলাইনে মৌসুমি ফল বিক্রির সংস্কৃতি এবং দিন দিন বাড়ছে এ প্রবণতা ও সেলারের সংখ্যা। স্বাভাবিকভাবেই একটা নতুন ব্যবসা বা ব্যবসার ধারা তৈরি হলে তাতে অনেক সমস্যা ধরা পড়ে এবং এদেশে ভালো কিছুকে নষ্ট করার লোকের যেহেতু অভাব হয় না, তাই অনলাইনে ফল বিক্রির এই সম্ভাবনাময় খাতেও বেশ কিছু সমস্যা চোখে পড়ছে। গ্রাহকদের অভিযোগের পাহাড় জমলেও মজার বিষয় হলো সেলাররা কিন্তু ঠিকই ধুমায়া সেল করছে। এক ভাই দেখলাম রাজশাহী শুরু করতে না করতেই সাতক্ষিরা দিয়েই ৪০০০ কেজি আম সেল করে ফেলেছেন। আরেক ভাই পিক আপে করে আম এনে নগদেই শেষ।

একদিকে অভিযোগের পাহাড় আবার আরেকদিকে ক্রমবর্ধমান সেলারের সংখ্যা এইখাতকে নিয়ে কৌতুহলের জন্ম দেয়, যার ফলাফল এই আর্টিকেল। এখানে ফল হিসেবে আম ব্যবহার করা হলেও আমের জায়গায় মৌসুমী যেকোন ফলই বসানো যাবে। আর্টিকেলটিকে আমরা পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছি:

ক) অনলাইনে আম বিক্রির সূত্রপাত

খ) অনলাইনে কেনো এতো আম বিক্রেতা

গ) অনলাইনে আম কেনায় সুবিধা বা মানুষ কেনো অনলাইন থেকে আম কিনে

ঘ) অনলাইনে আম কেনায় সমস্যা

ঙ) অনলাইনে আম বিক্রি বাড়াতে করণীয়।

চলুন শুরু করা যাক।

ক) অনলাইনে আম বিক্রির সূত্রপাত:

একটা সময় এদেশের অফলাইন মার্কেটে প্রাপ্ত আমগুলোতে কেমিকেল ও ফরমালিনের যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয় বলে ঢালাও অভিযোগ তোলা হয়। সরকারও এসময় বাজারে বিভিন্ন ধরনের অভিযান চালিয়ে কেমিকেলযুক্ত আম ধ্বংস করেছে। এইসময়টাতে কিছু সচেতন, শিক্ষিত মানুষজন নিজস্ব উদ্যোগে কেমিকেল ও ফরমালিনমুক্ত আমের উৎপাদন শুরু করে এবং ফেসবুকের মাধ্যমে বিক্রি করে। কালক্রমে অনেক ঘাটের জল খেয়ে অনেক ব্যবসায়ীর চালান খেয়ে তাদের পথে বসিয়ে আমরা এখন জানতে পারি প্রোটিন ও সবজিতে ফরমালিন কাজ করে না। সরকারের টানা অভিযান ও প্রচারণার ফলে কার্বাইডের ব্যবহারও প্রায় জিরোতে চলে এসেছে। এরপর থাকছে কীটনাশকসহ অন্যান্য যে বীষগুলো দেয়া হয় তা নিয়ে। আসলে যারা সম্পূর্ণ কেমিকেলমুক্ত আম বলে বিক্রি করছে হয় তারা অজ্ঞতাবশত এসব কথা বলেছেন অথবা মিথ্যে বলেছেন। কেমিকেলের ইউস ছাড়া পোঁকামুক্ত আম ঘরে পৌছানো কোনভাবেই সম্ভব না। ব্যাগিং আমে হয়তো কিছুটা কম কেমিকেল দিতে হয় বাট সেটার প্রোডাকশন খুবই কম এবং প্রাইস প্রায় তিনগুণ, হিসেবের বাইরে।

খ) অনলাইনে কেনো এতো আম বিক্রেতা

১) তুমুল চাহিদা:

কাঠাল আমাদের জাতীয় ফল হলেও আমের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এরকম সুমিষ্ট, সুস্বাদু ও রসালো ফল খুব কমই আছে। বিদেশী ফল যেমন আপেল, আঙ্গুর, মাল্টা, কমলা ইত্যাদির বছরব্যাপি দাপট থাকলেও আমের এই সময়টাতে সবগুলোর চাহিদা কমে যায় এবং দাম সিজনের মধ্যে সবচেয়ে কম থাকে। আমের এই তুমুল জনপ্রিয়তার কারণে স্বাভাবিকভাবেই সেলারের সংখ্যাও অনেক বেশি থাকে, অনলাইনে, অফলাইনে।

২) শেলফ লাইফ :

অন্যান্য সিজনাল ফলের তুলনায় আমের শেলফ লাইফ বেশি। আমের মতো লিচুও অনেক সুস্বাদু ও রসালো ফল হলেও লিচুর শেলফ লাইফ খুবই কম। হারভেস্ট করার এক দিনের মধ্যে কাস্টমারের ঘরে পৌছাতে না পারলে লিচুর কোয়ালিটির বারোটা বেজে যায়। পক্ষান্তরে, আম হারভেস্ট করার ৮-১০ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে এবং ভালোমতো পরিবহন করলে অক্ষত অবস্থায় কাস্টমারের ঘরে পৌছানো সম্ভব।

৩) ফ্লাশ সেল:

যেহেতু আমের চাহিদা বেশি, তাই ফ্লাশ সেলের মাধ্যমে ভালো একটা প্রফিট গেইন করা যায়। দুই-তিন মাসের মধ্যে ক্যাশ রোলিং করে সেটাকে বেশ সমৃদ্ধ করা যায়।

৪) ব্রান্ড প্রেজেন্স:

অনলাইনের এই যুগে ব্রান্ড প্রেজেন্সটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সবাই যখন আম নিয়ে ব্যস্ত, আমের ভিডিও দিচ্ছে, লাইভ করছে, ছবি দিচ্ছে, সেখানে আম নিয়ে কাজ না করা মানে নিজের ব্রান্ডের প্রেজেন্সটা কম হওয়া। অনলাইনে প্রচুর সেলার, এরমধ্যে চুপচাপ থাকা মানে ব্রান্ডের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। নিজের ব্রান্ডের প্রেজেন্সটা প্রমিমেন্ট করার জন্যও অনেকে আমের ব্যবসা চালিয়ে নেন, তাতে লাভের পরিমাণ কম হলেও বা ঝামেলা বেশি হলেও।

৫) ইকো-সিস্টেম:

বিগত কয়েক বছরে পারমিদাসহ বেশ কিছু সেলারের অক্লান্ত পরিশ্রমে অনলাইনে আম বিক্রির ইকো-সিস্টেম দাড়িয়ে গিয়েছে, যদিও এখনও কিছু সমস্যা বর্তমান। চাষী ও সাপ্লায়ার পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে, আম উৎপাদনের জায়গাগুলোতে প্রায় সমস্ত কুরিয়ার. ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির শাখা খুলেছে, সরকার আম পরিবহনের জন্য স্পেশাল ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে। এছাড়া বিকাশসহ এমএফএস, ব্যাংক, ইন্টারনেট সেবা ইত্যাদি অনলাইনে আম বিক্রির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

৬) সিজনাল সেলার:

রাজশাহী, চাপাই, নাটোর, নওগাঁ, সাতক্ষিরা ও রংপুরের অনেক মানুষ এসময় সিজনাল আম বিক্রিতে নেমে যায়। বিশেষত, ছাত্র ও চাকরীজীবি যাদের নেটওয়ার্ক ভালো তারা এসময় আম ব্যবসায়ী হয়ে যায়। সিজনাল এই সেলারদের উপস্থিতির কারণে চারদিকে এতো আম ব্যবসায়ী মনে হয়।

গ) অনলাইনে আম কেনায় সুবিধা বা মানুষ কেনো অনলাইন থেকে আম কিনে

অনলাইনে মূলত ফরমালিন ও কেমিকেলমুক্ত বলে আম বিক্রি শুরু হয়। কেউ কেউ এখনো ফরমালিন ও কেমিকেলমুক্ত বলে আম বিক্রি করলেও বর্তমানে মূলত এই ইস্যুর বাইরে অনেক সুবিধা যুক্ত হয়েছে যার কারণে মানুষজন অনলাইনে আম ক্রয়ের দিকে ঝুঁকছে। অনলাইন থেকে মানুষ আম কেনো কিনছে এই প্রশ্নটা আমরা Bangladesh Islamic Brands Forum (BIBF) এ রেখেছিলাম। সেখানে বেশকিছু অবজারভেশন উঠে এসেছে এ ব্যাপারে:

(১) অর্ডার করার সহজতা:

খুব সহজেই এখন অনলাইনে অর্ডার করা যায়। কোন কিছু অর্ডার করতে এখন আর ওয়েবসাইটেও যেতে হয় না। ফেসবুকের র্যান্ডম ব্রাউজের সময় কারও আম নিয়ে দেয়া কোন পোষ্টে যেয়ে কমেন্ট করলেই হয়, ‘ভাই আমার কাছে ২০ কেজি পাঠায় দিয়েন।’ ব্যস, ব্যুম। বাসায় চলে আসলো বা কুরিয়ারে।

(২) উপহার দেয়া:

কুরিয়ারে যেকোন লোকেশনে সেন্ড করা যায় দেখে অনেকে গিফট দিতে পারে। একে অন্যকে কিনে দেয়। এর জন্য অনেকেই অনলাইন আম সেলারদের দারস্থ হচ্ছেন।

(৩) অনলাইন নির্ভরতা:

এখন সব কিছুরই অনলাইন সেল বাড়ছে। মানুষ মাছ, মুরগী, হাস, ডিম, ভুঁড়ি সবই অনলাইনে কিনছে যেহেতু এফ্লুয়েন্ট মিডল ক্লাস বাড়ছে। মেয়েরা জবে ঢুকসে। বাসার কাজ শর্টকাট মেরে দিচ্ছে অনলাইনে দাম বেশী হলেও। মানুষ দিন দিন কম পরিশ্রমে ভালো আউটপুট পেতে অভ্যস্ত হচ্ছে। অনলাইন নির্ভরতা বাড়ছে। সময় বাঁচছে। হোম ডেলিভারিতে টাকা বেশী দিলেও নেয়।

(৪) অফলাইন সেলারদের দুর্ব্যবহার ও অসততা:

অফলাইনের বেশির ভাগ আম বিক্রেতা ক্রেতাকে মূল্যয়ন করে না যেহেতু তাদের জবাবদিহীতা নেই, এক আম বলে অন্য আম দেওয়া, অপুক্ত আম মিক্স করা, ওজনে কম দেওয়া। তার উপর আমের স্বাদ নিয়ে বেশির ভাগই সত্য কথা বলে না। তাদের মূলত রিপিট কাস্টমার দরকার নেই তাই তাদের স্টক খালি করাটাই থাকে মূল লক্ষ্য। এলাকার কিছু দোকানি হয়তো ভিন্ন হতে পারে তবে সেখানে তারা বেশি দাম নিয়ে পুষিয়ে নেই অনলাইনের মতই।

(৫) ট্রেসেবিলিটি:

অনলাইনে অধিকাংশ পরিচিত ব্যবসায়ী, ট্রেস করা সহজ। অনলাইন পুরাতন ব্যবসায়ীরা তাদের রেপুটেশনের ভয়ে, চেষ্টা করে, ওজন, সঠিক আম, সঠিক সেবা দেওয়ার জন্য যেন পরবর্তীতে সেই ক্রেতা তার কাছ থেকে আবার আম নেয়।

(৬) মিক্সড আম:

বাজারে মিক্সড আম পাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে অনলাইনে যেটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। যারা মূলত আম প্রেমী তারাই যেহেতু কিনে তাই তাদের কাছে মিক্সড আমের সম্ভাবনা এড়ানোটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট।

(৭) রিটার্ন/রিফান্ড পলিসি:

অনলাইনের অধিকাংশ ব্যবসায়ীর রিফান্ড পলিসি স্ট্রং। আম নিয়ে অসন্তুষ্টি থাকলে অধিকাংশ সেলার রিফান্ড প্রদান করে।

(৮) প্রিমিয়াম প্যাকেজিং:

অধিকাংশ অনলাইন শপে আকর্ষণীয় ও মজবুত প্যাকেজিং করা হয়। যারা একটু প্রিমিয়াম ইউসার ও গিফট দিতে চায় অন্যকে তাদের প্রথম পছন্দ থাকে অনলাইন।

(৯) স্মার্ট সেলার:

অনলাইন সেলারদের আকর্ষণীয়, পরিমিত, শিষ্টাচার সম্পন্ন ব্যবহার ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে অনলাইনে কেনাকাটা করতে যা পাড়ার দোকানদারদের থেকে পাওয়া যায় না।

গ) অনলাইনে আম কেনায় সমস্যা

লেখাটি মূলত শুরু হয়েছিল মূলত অনলাইন আম কেনা নিয়ে একভাইয়ের নেতিবাচক পোষ্ট দিয়ে। সেই ভাইয়ের পোষ্ট, আমার নিজের অবসারভেশন এবং ফেসবুকে আরও অনেকের নেতিবাচক মন্তব্য নিয়ে ধারণা হয়েছিল অনলাইনে আম বিক্রি নিয়ে সবার অভিযোগ আর অভিযোগ। অনলাইনে আম বিক্রির ভবিষ্যত মনে হয় অন্ধকার। কিন্তু পোষ্ট লেখার রসদ সংগ্রহ করতে যেয়ে দেখি পরিস্থিতি উল্টো সবাই খুব ভালো ব্যবসা করছে অনলাইনে এবং দিনকে দিন সেলারের সংখ্যা বাড়ছে। তবে অনলাইনে আম কিনতে যেয়ে গ্রাহককে যে বিড়ম্বনা বা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না তা কিন্তু না। চলুন দেখে নেয়া যাক অনলাইনে আম কেনার সমস্যাগুলো কি কি:

১) আম সম্বন্ধে সঠিক ধারণা না থাকা:

অনলাইনের অধিকাংশ সেলার আরেকজনের ঘাড়ে কাঠাল ভেঙ্গে খায়। তারা নিজেরা আম সম্বন্ধে সঠিক ও গভীর ধারণা ছাড়া শুধু ভাসা ভাসা কিছু লেখা ও কথামালার দ্বারা আম বিক্রি করার চেষ্টা করে। কোন আম কখন পাঁকে, কখন সুস্বাদু হয়, দেখতে কেমন এগুলো জানা ছাড়াই ফোনে ফোনেই ব্যবসা করতে চায়। ফলে প্রথম প্রথম দুয়েকটা চালান ভালো পড়লেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঠকতে হয় যার আল্টিমেট ভুক্তভোগি হচ্ছেন ভোক্তা।

২) কুরিয়ার চার্জ:

অনলাইনে আম কিনলে প্রতি কেজিতে কুরিয়ার চার্জ ও অন্যান্য খরচবাবদ অতিরিক্ত ২০-৩০ টাকা দিতে হয়, যা অফলাইন সেলারের নিকট থেকে ক্রয় করলে বেঁচে যায়। অফলাইন সেলাররা অনেক হিউজ এমাউন্ট আম নিয়ে আসে বলে তাদের ট্রান্সপোর্টেশন খরচ অনেক কম পড়ে। অনলাইনে আম বিক্রির অন্যতম বড় বাঁধা হলো এই কুরিয়ার চার্জ।

৩) পরিবহনে আম নষ্ট হওয়া:

অফলাইনে আম কিনলে দেখে-শুনে যাচাই বাছাই কিনে আম কেনা যায়, কিন্তু অনলাইনে আম ক্রয়ের ক্ষেত্রে এক ক্যারেট বা এক কার্টুন কিনতে হয়, পেমেন্ট অধিকাংশ সময় আগে করে দিতে হয়, পরিবহনে আম ক্ষতিগ্রস্থ হলে তার দ্বায় গ্রাহককে বহন করতে হয়। কুরিয়ার কোম্পানির লোকজন বড় অযত্নে আম পরিবহন করে যেকারণে আম নষ্ট হওয়ার হারও অনেক বেশি থাকে।

৪) পরিমাণে বেশি কিনতে হয়:

অনলাইনে এক সাথে বেশি আম কিনতে হয় ফলে আমের একটা অংশ বাসাতে থেকে পচে যেটা পরে ফেলে দিয়ে আমের ভাল অংশটা খেতে হয়| কুরিয়ার খরচ ও অন্যান্য খরচ অনেক বেশি হয় বলে কম কোয়ান্টিটি নিলে দাম অনেক বেশি পড়ে যায়।

৫) হোম ডেলিভারি না পাওয়া:

অধিকাংশ অনলাইন আম সেলারের ঢাকায় নিজস্ব ডেলিভারি চ্যানেল নেই। ঢাকার বাইরে থেকে কুরিয়ারে তারা আম পাঠিয়ে দেয়, সে আম রিক্সাভাড়া দিয়ে ঘাড়ে করে বহন করে বাসায় আনতে হয়। যে স্বাচ্ছন্দের জন্য মানুষ অনলাইন থেকে আম কিনে, উল্টো এক্ষেত্রে আরও বিড়ম্বনার স্বীকার হতে হয়। কুরিয়ার অনেক সময় ডিলে করে, সেক্ষেত্রে আম পচে পুচে বিড়ম্বনার মাত্রা বেড়ে যায়।

ঙ) অনলাইনে আম বিক্রি বাড়াতে করণীয়:

শত সমস্যা, হাজারো অভিযোগের পরও ক্রেতারা আম কেনার ক্ষেত্রে অনলাইনের দারস্থ হচ্ছেন, আমের বিক্রি বাড়ছে, বাড়ছে সেলারের সংখ্যা। ফ্লাশ সেলের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে ভালো একটা প্রফিট জেনারেট করা এবং নিজের ব্রান্ডের উপস্থিতি জানান দেয়ার জন্য অনলাইনে আম বিক্রির বিকল্প নেই। বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করে সুপিরিয়র গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে নিজের ব্রান্ড ভ্যালু যেমন বাড়ানো সম্ভব তেমনি পুরো ইকো-সিস্টেমটাও ডেভেলপ করা সম্ভব। বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করে অনলাইনে আম বিক্রি বাড়াতে করণীয় সম্বন্ধে কিছু সুপারিশ করা হলো:

১) নিজস্ব ডেলিভারি চ্যানের ডেভেলপ করা:

অনলাইনে মানুষ প্রোডাক্ট অর্ডার করে কনভিনিয়েন্সের জন্য। আম অর্ডার করে যদি রিক্সাভাড়া দিয়ে কুরিয়ার পয়েন্ট থেকে ঘাড়ে করে আম আনতে হয় তাহলে আর কি লাভ হলো। মানুষ অনলাইনের বদলে বাসার সামনের মোড়ের দোকান বা ভ্যানপ্লাজাকেই প্রাধান্য দিবে। কুরিয়ার সার্ভিস যারা হোম ডেলিভারি দেয়, যে পরিমাণ চার্জ তারা নেয় সেই টাকা দিয়ে সমপরিমাণ আম অর্ডার করা সম্ভব। এসমস্যা দূরীকরণে নিজস্ব ডেলিভারি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করার কোন বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে কয়েকজন সেলার মিলে সিন্ডিকেট গঠন করে একসাথে কাজ করা যেতে পারে।

২) কম কোয়ান্টিটি অর্ডার করার ব্যবস্থা:

অনলাইন আম পরিবহন মূলত প্লাষ্টিকের ক্যারেটের মাধ্যমে করা হয়। এক ক্যারেটে ২০ কেজি, ছোটগুলোতে ১২ কেজির মতো আম ধরে। প্লাষ্টিক কারখানাগুলোতে অর্ডার দিয়ে ছোট ক্যারেট বা এজাতীয় পাত্রের মাধ্যমে এরচেয়ে কম কোয়ান্টিটি আম ডেলিভারির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে করে ছোট পরিবার বা যাদের কম কোয়ান্টিটির আম দরকার, তাদের যেন বেশি আম নিয়ে পচিয়ে ফেলতে না হয়।

৩) চাষী ও আড়ৎদার পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি:

স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে মানুষ অনলাইনে কেমিকেলমুক্ত আমের দারস্থ হয়েছে। অনেক আমচাষী অজ্ঞতার কারণে অপরিমীতভাবে রাসায়নিক, গ্রোথ হরমোন ও সিনথেটিক সারের ব্যবহার করে আমকে বিষাক্ত করে তুলছে। নিরাপদ আম উৎপাদনের ব্যাপারে কৃষক ও আড়ৎদার পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রয়োজনে অগ্রিম অর্থ প্রদান করে বাগান বুক করে আমচাষের সাথে যুক্ত হতে হবে বা ক্লোজ সুপারভিশন করতে হবে।

৪) ব্রান্ডিং ও প্যাকেজিং এ নজর:

অনলাইনে হাজারো সেলারের ভীড়ে নিজের ব্রান্ডকে পৃথক করার জন্য সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হলো ব্রান্ডিং ও প্যাকেজিং নজর দেয়া। অনলাইনে মূলত প্রিমিয়াম গ্রাহকেরা আম ক্রয় করে থাকে এবং উপহারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। এক্ষেত্রে আমের প্যাকেজিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

৫) রিফান্ড পলিসি ও আফটার সেলস সার্ভিস:

লংটার্মে ব্রান্ডকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য দাম কমানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় না নেমে সেলারদের ব্রান্ডিং, প্যাকেজিং ও আফটার সেলস সার্ভিস উন্নতিকরণে নজর দেয়া উচিত।

উপসংহার:

অনলাইনে আম বিক্রি নিয়ে অনেক নেগেটিভ প্রচারণা, প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও বাস্তবতা হলো অনলাইনে আম কেনার প্রবণতা বাড়ছে এবং ট্রেন্ড এনালিসিস করে এটা হলফ করে বলা যায়, অনলাইনে আম বিক্রির ভবিষ্যত উজ্জ্বল। কাষ্টমারের ভ্যালিড অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে দ্রুততম সময়ে মানসম্মত নিরাপদ আম নায্যমূল্যে উত্তম ও ব্যতিক্রমী প্যাকেজিং এ যদি কাষ্টমারের নিকট পৌছানো যায়, তবে হাজারো সেলারের ভীড়ে নিজের একটা শক্ত অবস্থান তৈরী হবে এবং আরও অধিক সংখ্যক গ্রাহক অনলাইনে আম ক্রেতার প্রতি আগ্রহী হবে। ঢাকা শহরের ব্যস্ত জীবনে ট্রাফিক জ্যাম মাড়িয়ে কেনাকাটার বিপরীতে অনলাইনে কেনাকাটার কোন বিকল্প নেই। অনলাইন শপিংয়ের এই অগ্রযাত্রা রোধ হবার নয়। এই মার্কেট প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং বাড়বে। বিষয় হচ্ছে আমি এই অপার সম্ভবনার মার্কেটে একজন সেলার হিসেবে নিজের জায়গা করে নিতে পারছি কিনা। প্রতিবছর আমাদের কমিউনিটিতে নতুন নতুন সেলার আসছে এবং নিরবে নিভৃতে হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাইনা যে আগ্রহ নিয়ে, উদ্দীপনা নিয়ে সেলাররা জ্বলে উঠছে তা অপরিচর্যা, অযত্নে নিভে যাক। আমাদের সেলাররা জ্বলে উঠুক আপন শক্তিতে, ধ্রুবতারা হয়ে আলো বিলিয়ে যাক শতসহস্র বছর।