Categories
ব্যবসা ও অর্থনীতি

৭টি কারণ, কেনো বিজনেসে ডাইভার্সিফিকেশন প্রয়োজন

এই লেখাটি মূলত আমার শুভানুধ্যায়ী ও নিকটজনদের জন্য লেখা। তাদের অনেকের অভিযোগ আমি বিজনেসে ফোকাসড না। আজ এই মাস্ক, তো কাল মশলা, পরশু ব্যাগ, তো তরশু টিশার্ট। ছোটবেলা থেকেই আমি একটু অস্থির প্রকৃতির, এটা সত্য। পরীক্ষার খাতা রিভিশন না দেয়ার জন্য আম্মুর বকা খাওয়া ছিল কমন। পরীক্ষা দেয়ার পর সেই খাতা রিভিশন দেয়ার মতো ধৈর্য্য আমার কখনই ছিলো না। বড়বেলাতে এসেও এই যে ব্যবসায় বৈচিত্র্য, এতেও যে সেই চাঞ্চল্য নেই তা কিন্তু অস্বীকার করছি না, হয়তো আরেকটু ধীরে চলা বা আরেকটু ফোকাস হওয়া উচিত ছিল, তবে এই ডাইভার্সিফিকেশনের পেছনে কিন্তু অনেকগুলো কারণ রয়েছে এবং এগুলো ব্যাকড বাই থিওরী। তাই এই লেখাটি নিজের স্বীকারোক্তিমূলক লেখা হলেও আশা করি নতুনদের জন্য কাজে দিবে। তো চলুন শুরু করা যাক, কেনো বিজনেসে ডাইভার্সিফিকেশন জরুরি বা বিজনেস ইউনিট বাড়লে এটা আপনাকে ব্যবসায় কি কি সুবিধা দিবে।

১) ডেলিভারি চেইনে সুবিধাঃ

বিজনেস ডাইভার্সিফিকেশন করার পেছনে আমার অন্যতম কারণ হলো ডেলিভারি চেইনে বেনিফিট নিয়ে আসা। আমার যাত্রা শুরু এবং অদ্যাবধি পথচলা অনলাইনে। যারা এই লাইনে কাজ করছেন তারাই জানেন এব্যবসার প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ডেলিভারি চ্যানেলটা মেইনটেইন করা। থার্ড পার্টি কুরিয়ার হ্যান্ডেল করার মতো প্যারা আর দ্বিতীয়টি নেই। কিন্তু ৮-১০ টা ডেলিভারি ডেইলি না থাকলে নিজের একটা ডেলিভারি চ্যানেল ডেভেলপ করারও হাতি পোষার সামিল। কিন্তু ফেসবুকের একটা ছোট বিজনেস থেকে ডেইলী ৮-১০ অর্ডার পাওয়া অনেক কঠিন। তাই এরকম ছোট ছোট ২-৩ টা ভেঞ্চার আপনাকে এনে দিতে পারে সেই কাঙ্ক্ষিত ৮-১০ টা অর্ডার। ফলে আপনি নিজের মতো করে ডেলিভারি চ্যানেলটা সাজাতে পারবেন। ডেলিভারিম্যানকে COD দিয়ে প্রোডাক্ট পাঠিয়ে দেয়ার পর কাস্টমার যদি ফোন দিয়ে বলেন, বিকাশে পেমেন্ট দিবেন, ব্যস একটা ফোনকল যথেষ্ট। টি-শার্ট, পিপিই ৩-৪ টা পাঠিয়ে দিতে পারবেন কাস্টমারের নিজে পছন্দ করে নেয়ার জন্য, যেকোন ইস্যু খুব দ্রুত ও সহজে ম্যানেজ করা যায় নিজের ডেলিভারিম্যান থাকলে, যেটা থার্ড পার্টিতে হ্যান্ডেল করা খুব কঠিন, মাঝে মাঝে অসম্ভব।

২) নেক্সট লেভেলে যাওয়াঃ

প্রত্যেকটা ব্যবসার অনেকগুলো পর্যায় থাকে। সবাই শুরুতে ছোট আকারে শুরু করলেও সবার স্বপ্ন থাকে সেটাকে আরও বড় করা, কমার্শিয়ালাইজেশন করা বা পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়া যেটাকে কেতাবী ভাষায় ‘স্কেল আপ’ বলে। যেকোন ব্যবসা শুরু করে সেটাকে একটা পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সহজ, স্কেল আপ করতে গেলে অনেক ফান্ডের দরকার, অনেক সময়ের দরকার। আমি যেহেতু ব্যাংক লোন নিবো না বা পর্যাপ্ত সময় দিতে পারি না, তাই আমার জন্য একটাকে নিয়ে পড়ে থাকা যুক্তিহীন। তাই একটা ভেঞ্চারকে একটা লেভেলে নিয়ে যাবার পর আরেকটা এরকম ছোট উদ্যোগ শুরু করি। আমার লক্ষ্য হলো এরকম ২-৩ টা উদ্যোগকে সাথে নিয়ে একসাথে প্যারালালি নেক্সট লেভেলে যাওয়া বা স্কেল আপ করা।

৩) রিসোর্সের অপটিমাম ইউটিলাইজেশনঃ

আপনার ২-৩ টা ভেঞ্চার (এগুলোকে বিজনেসের ভাষায় SBU বলে, Strategic Business Unit, এরপর থেকে আমরা SBU টার্মটা ইউস করবো) থাকলে একই রিসোর্স আপনি সবগুলোতে কাজে লাগাতে পারবেন। আমার ব্যাগের প্রিন্টিং সেট আপ দিয়েই টিশার্ট তৈরি করতে পারছি, টিশার্ট শোরুমের ম্যানেজারকে দিয়ে খাবার প্যাকেজিং করাতে পারছি, কারখানার ওয়ার্কার দিয়ে হোম ডেলিভারি দেওয়াতে পারছি। সীমিত রিসোর্সকে আপনি অপটিমাম ইউস করতে পারবেন SBU থাকলে। এজন্য ডাইভার্সিফিকেশন জরুরী।

৪) ক্যাশ কাউ জেনারেট করাঃ

ক্যাশ কাউ বলে ওই বিজনেসকে যেটা আপনাকে অল্প পরিশ্রম ও ইনভেস্টমেন্ট এ ক্যাশ দিতেই থাকবে। যেকোন ব্যবসায়ীর জন্য ক্যাশ কাউ ডেভেলপ করা স্বপ্নের মতো। কারও প্রথম উদ্যোগই ক্যাশ কাউ হয়ে যায়, কারও বা লাগে ৮-১০ টি ভেঞ্চার। এরকম একটা ক্যাশ কাউ থাকলে বিজনেস সাসটেইন করা বা বাকিগুলোকে টেনে নেয়া ইজি। আমি যেহেতু এখনও ক্যাশ কাউয়ের সন্ধান পাইনি, তাই বাড়িয়েই চলছি ব্যবসা, দেখি কবে দেখা পাই সেই দুধেল গরুর।

৫) নতুন শুরুর উত্তেজনাঃ

মানুষ এইযে এতো কষ্ট করে অ্যাডভেঞ্চারে যায়, মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে উঠে, কিসের জন্য? নতুন কিছু করা, নতুন কিছু দেখার উত্তেজনা থেকেই তো। নতুন একটি বিজনেসও এরকম নতুন একটি উত্তেজনা, অদেখাকে দেখা, অজানাকে জানা, এ্যাড্রেনালিন রাশ। একই বিজনেসে বছরের পর বছর পরে থাকা একঘেয়েমি এনে দিতে পারে, বিজনেসের প্রতিই বিরক্তি এনে দিতে পারে, ফ্যাটিগ তৈরি করতে পারে। নতুন একটি বিজনেস, ফ্রেশ একটি স্টার্ট, আপনাকে উজ্জীবিত করতে পারে, নতুন কিছু জানা, নতুন কিছু শেখার উত্তেজনা এনে দিতে পারে, যা কোন অংশেই পাহাড়ে উঠা বা অ্যাডভেঞ্চার করার চেয়ে কম নয়।

৬) অফসিজনে বসে না থাকাঃ

প্রায় প্রতিটা বিজনেসে সিজন, অফসিজন আছে, পিক টাইম, অফ টাইম আছে। অফসিজনে এমপ্লয়ি পোষা হাতি পোষার সামিল, আবার তাদেরকে যে ছেড়ে দিবেন বা টিম ছোট করবেন তাতেও সমস্যা, পিক টাইমে বিপদে পড়বেন। SBU থাকলে আপনি একটা বিজনেসের অফসিজনে আপনার টিমকে অন্য বিজনেসে কাজে লাগাতে পারবেন। করোনার এই সময়ে ব্যবসার ধীরগতির কারণে আমাদের ব্যাগের ব্যবসায় মন্দা চলছে, তবে আমরা কিন্তু বসে নেই। পুরো টিমকে মাস্ক, খাবার, টিশার্ট এর কাজে লাগিয়ে দিয়েছি, হোম ডেলিভারিতে ব্যস্ত আছি। শুধু ব্যাগ নিয়ে পড়ে থাকলে ব্যবসা বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকতো না।

৭) ক্রোস সেলিংঃ

একটা বিজনেসে আপনার একটা ভালো কাষ্টমার বেস তৈরি হলে বা একটা গুড রেপুটেশন তৈরি হলে এই কাষ্টমার বেসকে আপনি আপনার অন্য বিজনেসেও কাজে লাগাতে পারবেন। যে আপনার খাবারের প্রোডাক্ট এ সন্তুষ্ট, আপনি যখন মাস্ক নিয়ে আসবেন, তখন তিনি এধারণাটা পাবেন যে হাজারও ভেজালের ভীড়ে আপনি তাকে ভালো জিনিসটাই দিবেন। আমার কাছে কেউ যখন মাস্কের খোজ করে, তখন তাকে খাবারের লিস্টটাও ধরিয়ে দেই বা ভাইস ভার্সা, আর কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করি। SBU এর মাধ্যমে আপনি এরকম ক্রোস সেল করতে পারবেন।

এগুলোর বাইরেও বই ও আর্টিকেলে বিজনেস ডাইভার্সিফিকেশনের আরও অনেক বেনিফিট পাবেন, রিস্ক মিনিমাইজেশন, কস্ট কাটিং সহ আরও অনেক কিছু। ফাইন্যান্সে তো খুব পপুলার একটা প্রবাদ আছে ডাইভার্সিফিকেশন নিয়ে- “Don’t put your all eggs in one busket”. তবে বিজনেস ডাইভার্সিফিকেশনের অনেক নেগেটিভ সাইডও আছে। বিজনেসে ফোকাস নষ্ট হয়ে যায়, গ্রোথ কমে যায়, মাল্টিটাস্কিং না হলে ম্যানেজ করা খুব ডিফিকাল্ট। তাই উপরে উল্লেখিত পয়েন্টগুলোর আলোকে আপনার নিজেকেই ডিসিশন নিতে হবে কখন ডাইভার্সিফিকেশন করবেন, কতটুকু করবেন, কিভাবে করবেন বা আদৌ করবেন কিনা, নাকি একটাতেই ফোকাস থেকে সেটাকে পিকে নিয়ে যাবেন।

Categories
ক্যারিয়ার

ছেলে কি করে, ‘বিদেশে থাকে’

মাঝখানে একটা ট্রল খুব দেখা যেত, “ছেলে কি করে, ‘বিদেশে থাকে’।” যেখানে দেশে থাকা পাত্রের চাকরী নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলে, পক্ষান্তরে পাত্র বিদেশ থাকলেই যেন ষোল আনা উসুল। বিদেশে থাকাই পাত্রের একমাত্র যোগ্যতা, সে সেখানকার ওসি না ডিসি সেগুলো বিবেচ্য নয়।

ওসি, ডিসির কাজ করা বা বিদেশে যেয়ে অড জব করার কোন সমালোচনা আমি করছি না বরং তার উল্টোটা। এদেশেই যখন কেউ এধরণের কাজ করতে যায়, আমরা সমালোচনার তুবড়ি ছোটাই, রে রে বলে তেড়ে আসি, চারদিকে জাত গেলো জাত গেলো শোড়গোল। যে করে তার চেয়ে লজ্জা যেন তার আশেপাশের লোকজনের বেশী। নিজে তো করবেই না বরং কেউ লজ্জার বাধ ভেঙ্গে যখন এগিয়ে আসে, পিয়ার প্রেশারে গুটিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

কোভিড ক্রাইসিস সব ভেঙ্গেচূড়ে দিচ্ছে। ব্যবসা বানিজ্য, চাকরি – বাকরি ; সব। বিসিএসের পড়া পড়ে আর লাভ নাই, কবে যে সার্কুলার হবে তার নাই ঠিক। ব্যাংকগুলা লোক নেয়া তো দূরের কথা ছাটাই করা শুরু করবে, এমএনসি, এফএমসিজি সব জায়গায় একই অবস্থা হতে যাচ্ছে। এই অচলাবস্থার শেষ কোথায় কেউ জানে না।

কোভিড যেভাবে সব ভেঙ্গে দিচ্ছে, সেভাবে যেন আমাদের অন্তরের ইগো, মিথ্যে অহমিকা এগুলোও যেন ভেঙ্গে দেয়। একজন যুবক পাশ করার পর ৭-৮ বছর চাকরির পড়া পড়ে বৃদ্ধ বাপের কাছ থেকে টাকা নিতে লজ্জা নেই, প্রতিদিন ৩-৪ ঘন্টা রিক্সা চালিয়ে ৫-৬ শ টাকা ইনকাম করা লজ্জা। নিজের লকবে বেকার টাইটেল লাগাতে লজ্জা নেই, সব লজ্জা একটা ভ্যানে করে বা ফুটপাতে কিছু প্রোডাক্ট বেচে হালালভাবে দুটো টাকা ইনকাম করতে।

অনেক বছর আগে দোকানের ম্যানেজারের জন্য ফেসবুকে এ্যাড দেয়ার পর বিবিএ করা একটা ছেলে এসেছিল চাকরীর জন্য। তাকে মার্কেটের বাইরে কার্টে কোল্ড কফি বিক্রেতাকে দেখিয়ে বলেছিলাম এর ইনকাম মাসে ত্রিশ হাজারের বেশী, ওই যে কলাওয়ালা সে-ও বিশের নীচে কামায় না। এইসব চাকরী না করে কোন ব্যবসার ধান্দা করেন। আপনি শিক্ষিত লোক, ছোট দিয়ে শুরু করলেও ওদের চেয়ে ভালো করতে পারবেন।

আমার দোকান
আমার দোকান

জানি ফেসবুকে এইসব বড় বড় কথা বলা অনেক সহজ, কিন্তু বাস্তবে কাজে ফলানো অনেক কঠিন। তাই ছবি দুটো দিলাম দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। জোশ গিয়ারের শোরুমের সামনে আমরা ফুটপাথে কোভিড রেসপন্স প্রোডাক্ট নিয়ে নেমেছি। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ অন্তর থেকে এইসব মেকি ইগো আস্তে আস্তে দূর করে দিচ্ছেন। গত কয়েকদিনে এ পর্যন্ত প্রায় ২০+ ডেলিভারি নিজ হাতে করেছি, আজকেও একটা দিয়ে আসলাম।

ছবি দুটো দিলাম নতুনদের উৎসাহ দেবার জন্য, আইস ব্রেকিং এর জন্য। আপনি বসে থাকলে কেউ এসে দশটাকা দিবে না, আপনি মাঠে নামলে তীর্যক কথা বলা লোকগুলো আপনার অসহায়ত্বের সময় পাশে দাড়াবে না। কাদের ভয়ে আপনি নামছেন না। আপনার জীবন আপনাকেই ডিসিশন নিতে হতে হবে। ‘পাশের বাড়ির আন্টি’ তীর্যক কথা ছাড়া আর কোন উপকার বা অপকার করতে পারবে না। সো তাদেরকে আর কতো পাত্তা দিয়ে নিজের জীবনটাকে নষ্ট করে দিবেন?

আল্লাহ আমাদের হালালভাবে রুজি অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন